শিরোনাম
আইডিইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড এন্টারপ্রেনার্স ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন এর কমিটি গঠন ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপ ক্যাশলেস সোসাইটি : জয় এসএমই ফাউন্ডেশনের ১০০’ কোটি টাকা ঋণের ৩৩ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের আঁতাতকরী বিএনপি নেতা নাসিরকে গনধোলাই দিলো কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা নিয়ে স্বজনপ্রীতি সহ্য করা হবে না : ওবায়দুল কাদের করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ৩২০০ কোটি টাকার নতুন প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হাসেম ফুড পরিদর্শনে এসে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, পুলিশের লাঠিচার্জ চলমান লকডাউন শিথিল, ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর বিধি-নিষেধের প্রজ্ঞাপন জারি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘে প্রস্তাব গৃহীত করোনা রোগীর চাপে চট্টগ্রাম মেডিকেলে সাধারণ রোগী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৫৬ অপরাহ্ন

আবিদুর রেজা খান- বঙ্গবন্ধুর অতি আপনজন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক

কাজী আব্দুস সবুর, লেখক ও গবেষক
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ, ২০২১
আবিদুর রেজা খান

একজন অসাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নতুন প্রজন্মের সন্তানদের কাছে তুলে ধরছি। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অতি আপনজন, একজন রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতার একজন, তুখোড় পার্লামেন্টেরিয়ান, সুপ্রিম কোর্টের খ্যাতিমান আইনজীবী, সাবেক দুইবার বাংলাদেশ সংসদে সদস্য নির্বাচিত হন।

আবিদুর রেজা খানের জন্ম ১৯২৭ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর শরিয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলায়। তিনি ফরিদপুর জেলার রাজেন্দ্র কলেজে পড়াশোনার সময়ে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি এবং তখনই তিনি বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে আসেন। তিনি বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ সদস্য ও পরবর্তীতে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তিনি শরিয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মাদারীপুরের বাকশালের গভর্ণর নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আবিদুর রেজা খান
পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করে ঢাকা বারে যোগদান করেন এবং জীবন সায়েহ্নে পর্যন্ত তিনি এই আইনের ভূবনে বিচরণ করেছেন। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হিসেবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের কালজয়ী সংগঠক প্রয়াত আবিদুর রেজা খানের স্মৃতি আজও ভাস্বর। তিনি ছিলেন আমাদের পথ প্রদর্শক, একজন আলোকিত মানুষ। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত উদার মনের মহৎ প্রাণের একজন মানুষ। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের কথা সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা যাবে না। কারণ তিনি নিজেই একটা ইতিহাস। তাঁকে কোনো বিশ্লেষণে ভূষিত করা মানে তাঁকে সীমিত করে দেখা। তিনি ছিলেন উচু মনের প্রগতিশীল মানুষ। তিনি আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে রাজনীতি, সমাজ সেবা, মানবকল্যাণে সারাজীবন কাজ করে গেছেন।
আবিদুর রেজা খান
শত ব্যস্ততার মাঝে এলাকার গরীব দুঃস্থ রোগীদের নিজ বাসায় এনে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে নিজ গাড়িতে করে হাসপাতালে ভর্তি করে ওষুধপত্র, যাবতীয় খরচ বহন করে মানবসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের বিনা পয়সায় আইনী সাহায্য করে গেছেন। তাঁর মত কর্মীবান্ধব, দরদী মুজিব আদর্শিক নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ আজ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কোনো প্রকার লোভ লালসা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে নি। তিনি ছিলেন একজন নির্লোভ, নিঃস্বার্থ সাহসী ও সৎ চরিত্রের মানুষ মন্ত্রী বা এমপি হ‌ওয়ার জন্য তিনি রাজনীতি করেননি। নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও মানব সেবার মহান মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে তিনি মানবতার সেবায় আজীবন কাজ করে গেছেন।

১৯৬২, ৬৬, ৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্ন জনসভায় যোগদান করে সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করেন। আওয়ামী লীগের একজন আইনজীবী হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুসহ অভিযুক্তদের মুক্ত করার জন্য আইনী লড়াইয়ে তিনি পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ঢাকা বারের আইনজীবীদের আওয়ামী লীগের পতাকা তলে ঐক্যবদ্ধ করার বিষয়ে তিনি অন্যান্য সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও তাঁর আদর্শ ছড়িয়ে দেন।

আবিদুর রেজা খান
আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার তিনি ছিলেন অন্যতম সংগঠক ছিলেন। ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম দিকে দেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাঁর দলীয় অনুসারীদের নিয়ে আগরতলায় চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় আগরতলায় মেলাঘর, বাঘমারা, বিজনা, হাতিমারা সহ বিভিন্ন ক্যাম্পে ছাত্র যুবকদের থাকা খাওয়া ট্রেনিং এর ব্যবস্থা, ওষুধপত্র সরবরাহ সহ সব ধরনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদ ডাকে সাড়া দিয়ে আগরতলা থেকে তিনি কলকাতাস্থ স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধান কার্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাকে নিয়োজিত রাখেন। তিনি পশ্চিম বাংলার খিলগাঁও, টাকি, কল্যাণী, সল্টগল, নীলক্ষেত সহ বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আবিদুর রেজা খানের এলিফ্যান্ট রোডস্থ বাসভবনে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ খবর জানতে চায়। বাসায় কয়েকদিন আসার পর তাকে না পেয়ে জেনারেল টিক্কা খানের এক আদেশে ৫ ব্যক্তিকে ২৬ এপ্রিল ১৯৭১ সকাল ৮টায় ১নং সেক্টরের উপসামরিক আইন প্রশাসকের অফিসে হাজির হওয়ার নোটিশ প্রদান করেন। উল্লিখিত ৫ জন হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল মান্নান, আবিদুর রেজা খান, তোফায়েল আহমেদের গ্রামের ঠিকানায় নোটিশ প্রেরণ করা হয়েছিল। অভিযুক্ত সকলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহীতা সহ একাধিক সামরিক বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছিলো। (সূত্র: আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের লেখা ব‌ই থেকে সংগৃহীত)। আবিদু্র রেজা খানের খোঁজে পাক গোয়েন্দার লোকজন গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ, মামা বাড়ি গোসাইরহাট শশুড় বাড়ি কালকিনি থানার গোপালপুরে খোঁজ খবর নেন। গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি করেন।

আবিদুর রেজা খান
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি কলকাতায় অবস্থান করেন। এসময় তিনি কলকাতায় অবস্থানরত কয়েক হাজার ছেলেদের দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় তিনি বৃহত্তর মাদারীপুরের আইন সৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। স্বাধীনতার পরে তিনি ইন্টার পার্লামেন্টেরিয়ান কনফারেন্সে বাংলাদেশ দলের সদস্য সচিব হিসেবে ১৯৭২ সালে তিনি রোম, ইংল্যান্ড ও জেনাভা গমন করেন। তাছাড়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর একাধিক দেশ সফর করেন। তিনি হাজী শরীয়তুল্লাহ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সারাজীবন তিনি গরীব মেধাবী ছাত্রদের লেখাপড়ার সহযোগিতা করে গেছেন। আবিদুর রেজা খান ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৫ সালে ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
আবিদুর রেজা খান
আজ আমরা মুজিব জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎযাপনের দিনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। মহান মুক্তিযুদ্ধে মৃত্যুঞ্জয়ী সংগঠক নির্লোভ সাহসী চরিত্রের মানুষ আবিদুর রেজা খানের মত দেশপ্রেমী, নিষ্কলুষ মানুষ যেন এই মাটিতে অধিক সংখ্যায় জন্ম গ্রহণ করে এই প্রার্থণা করি। তাঁর মৃত্যুঞ্জয়ী আদর্শের অনুশীলন ও মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমেই তিনি বেঁচে থাকবেন আগামী প্রজন্মের কাছে। তাঁর জীবন থেকে অনেক কিছুই আমরা শিখতে পারি। আমি তাঁর আত্মার শান্তি ও মাগফেরাত কামনা করি। 
                                                                                                                                                                                    লিখেছেনঃ কাজী আব্দুস সবুর, লেখক ও গবেষক


এই বিভাগের আরো খবর
greengrocers

Categories

Archives