শিরোনাম
আইডিইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড এন্টারপ্রেনার্স ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন এর কমিটি গঠন ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপ ক্যাশলেস সোসাইটি : জয় এসএমই ফাউন্ডেশনের ১০০’ কোটি টাকা ঋণের ৩৩ শতাংশ পেয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের আঁতাতকরী বিএনপি নেতা নাসিরকে গনধোলাই দিলো কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা নিয়ে স্বজনপ্রীতি সহ্য করা হবে না : ওবায়দুল কাদের করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ৩২০০ কোটি টাকার নতুন প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের হাসেম ফুড পরিদর্শনে এসে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, পুলিশের লাঠিচার্জ চলমান লকডাউন শিথিল, ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর বিধি-নিষেধের প্রজ্ঞাপন জারি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘে প্রস্তাব গৃহীত করোনা রোগীর চাপে চট্টগ্রাম মেডিকেলে সাধারণ রোগী ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৪৩ পূর্বাহ্ন

ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প

মুইদ হুসাইন, সিনিয়র রিপোর্টার
আপডেট সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

শুরুটা হয়েছিল ২০১৮ সালে ডিজিটাল সামিটের মাধ্যমে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের সকল গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট এর মাধ্যমে প্রেরণ করতে হবে।

 

 

সামিটে আরো উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ, বিকিএমইএ, ট্রেড ইউনিয়নের সম্মানিত নেতৃবৃন্দ এবং তারা সকলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরিতে সবাই একযোগে কাজ করবে বলে প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন। কিন্তু সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও ২০২০ সালের মার্চ নাগাদ কেবলমাত্র ১.৫মিলিয়ন গার্মেন্টস কর্মীকে ডিজিটাল পেমেন্ট এর আওতায় নিয়ে আসতে সমর্থ হয়। বাকি ৩.৫ মিলিয়ন শ্রমিক তখন ও এর বাইরেই থেকে যায়।

মূলত সুযোগটা আসে কোভিড-১৯ এ সারাদেশ যখন লকডাউন হয় তখন। বিদেশী ক্রেতারা বেশির ভাগ ক্রয় আদেশ বাতিল করে এবং লকডাউনে সারাদেশের সবকিছু বন্ধ হয়ে গেলে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি গুলো একরকম অচল হয়ে পরে। মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয় আমাদের গার্মেন্টস শিল্প। যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষাধিক লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে গার্মেন্টস শিল্পের সাথে জড়িত, তাই সরকার এই সেক্টরের জন্য অনেক বড় প্রণোদনা ঘোষণা করে। প্রণোদনার আওতায় সরকার সমস্ত গার্মেন্টস কারখানার তিন মাসের বেতন প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু সাথে সাথে নতুন শর্ত জুড়ে দেয়, কেবল মাত্র ওই সকল শিল্পকারখানা এই সুবিধা পাবে যারা শ্রমিকদের বেতন মোবাইল ব্যাংক একাউন্ট এর মাধ্যমে প্রেরণ করে থাকে । মার্চের ৩০ তারিখে এই ঘোষণা আসার পর কারখানা গুলো শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনার জোর প্রচেষ্টা চালায়। অন্যদিকে লকডাউন শুরু হওয়ায় কারখানা গুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং বেশির ভাগ শ্রমিক তাদের নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যায়। এমতাবস্থায় কারখানা গুলো শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাংক একাউন্ট খোলা নিয়ে নতুন সমস্যার সম্মুখীন হয়। কিন্তু ৩১শে মার্চ থেকে ১৫ই এপ্রিলের মধ্যে কারখানাগুলো তাদের কর্মীদের সাথে যোগাযোগপূর্বক বেশির ভাগ শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাংক একাউন্ট খুলতে সামর্থ্য হয়। মাত্র দুই সপ্তাহে ৩০ শতাংশ থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ গার্মেন্টস শ্রমিক ডিজিটাল পেমেন্ট এর আওতায় চলে আসে। এক ওয়েবিনারে অনন্ত এপারেলস এর ডিরেক্টর মাইশা খান জানান ” এটা ছিল অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ, আমাদের কারখানায় প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমিকের আগে থেকেই মোবাইল একাউন্ট ছিল কিন্তু বাকি শ্রমিকদের এর আওতায় নিয়ে আসা সত্যিই দুরূহ ছিল, কিন্তু মাত্র দুই সপ্তাহে আমরা আমাদের শতকরা ৯৪ শতাংশ শ্রমিক কে ডিজিটাল পেমেন্ট এর আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছি। বেশিরভাগ শ্রমিক গ্রামে ফিরে গিয়েছিলো এবং তাদের মোবাইল একাউন্ট খোলার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজ পত্রও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এতো সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সকলের সহযোগিতা এবং আন্তরিক চেষ্টার কারণে আমরা সফলভাবে আমাদের প্রায় সকল শ্রমিককে মোবাইল ব্যাংকিং এর আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছি”।

সরকারের এমন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে বৃহতসংখ্যক শ্রমিকরা মোবাইল ব্যাংকিং এর আওতায় আসলেও সাথে কিছু প্রতিবন্ধকতারও সৃষ্টি হয়। বেশিরভাগ শ্রমিকরা বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা এতে করে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়। মোবাইল ব্যাংকিং সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকা , শিক্ষার স্বল্পতা ও মোবাইল একাউন্ট পরিচালনায় নির্ভরশীলতা এই প্রতিবন্ধকতার মূল কারণ। এমএফও এবং সানেমের এক সমীক্ষায় দেখা যায় শতকরা ৮১ শতাংশ নারী শ্রমিক যারা মোবাইল ব্যাংক একাউন্ট নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে বাকি ১৯% নারী শ্রমিকরা এই মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। যে সকল নারী মোবাইল ব্যাংকিং এ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে তাদের মধ্যে শতকরা ৯০% দাবি করেছে যে মোবাইল ব্যাংকিং এর সুবাদে পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের গুরুত্ব বেড়েছে।

মোবাইল ব্যাংকিং নারীর ক্ষমতায়ন কে ত্বরান্বিত করছে এবং সর্বোপরি নারীর সামাজিক অবস্থান উন্নয়নে ও ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এর মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটি উঠে এসেছে তা হলো মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে সঠিক জ্ঞান। অনেকেই তাদের নিজেদের একাউন্ট এর গোপন নম্বর নিয়ে সচেতন না এবং শুধু এই কারণেই তারা বিভিন্ন ভাবে প্রতারিত হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের টাকাও চুরি হয়ে যাচ্ছে।

এক ওয়েবিনারে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডক্টর অনির চৌধুরী বলেছেন ” মূলত ডিজিটাল ওয়েজ পেমেন্ট এর বিষয়ে কোভিড-১৯ আমাদের জন্য একটা সুযোগ ছিল এবং আমরা সফল ভাবে সেই সুযোগকে কাজেও লাগিয়েছি। গত দুই বছর সরকার ও বিজিএমইএ ক্রমাগত চেষ্টা করেও কারখানা গুলোতে শতভাগ ডিজিটাল পেমেন্ট নিশ্চিত করতে পারেনি কিন্তু কোভিড-১৯ এর এই সময় মাত্র দুই সপ্তাহে ৩৫ লক্ষাধিক শ্রমিককে আমরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছি। এখন আমরা মনোনিবেশ করছি যেন শ্রমিকরা এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা ঠিকমতো পায় তার জন্য প্রয়োজনীয় ও সময় উপযোগী ব্যবস্থা নিতে”।

উন্নত দেশগুলো যেখানে তাদের শ্রমিকদের মজুরি থেকে শুরু করে সার্বিক পরিষেবা ব্যবস্থা ডিজিটালাইজড করেছে সেখানে ডিজিটাল ব্যাংকিং এ বাংলাদেশ এখন প্রাথমিক অবস্থায় আছে। এই ব্যাবস্থাকে সামনে এগিয়ে নিতে সবার আগে প্রয়োজন একটা পরিকল্পিত কাঠামো যেখান মানুষ খুব সহজেই এবং নির্বিঘ্নে এই পরিষেবার সাথে নিজেদের যুক্ত করবে।
Better Than Cash Allience এর ইনোভেশন লিডার মারজোলিন চেইনট্রু জানান ” সামগ্রিক ব্যবস্থা কে ডিজিটাল করার জন্য সবার আগে জরুরি একটা ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকার, কারখানা ও শ্রমিক সকলে একযোগে কাজ করে যাবে”। প্রাথমিক অবস্থায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রীভূত করতে হবে”।

বিএসআরের ডিরেক্টর ক্রিস্টিন সাভাড়ার জানান ” ডিজিটাল ফাইন্যান্সিং একাধারে যেমন মজুরি ব্যাবস্থাকে কে সহজতর করেছে , পাশাপাশি এটি নারীর ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে”। এক সমীক্ষায় দেখা যায় শতকরা ৯০ শতাংশ নারী নিশ্চিত করেছে যে ডিজিটাল ব্যাংকিং এর কারণে তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে এবং ২০ শতাংশ নারী নিশ্চিত করেছে পরিবারে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা এখন স্বামীর সাথে যৌথ ভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে’’।

গত কয়েক দশক ধরে আমরা নগদ অর্থ পরিশোধের মধ্যমে লেনদেন পরিচালনা করে আসছি কিন্তু হঠাৎ করেই অনলাইনে এই লেনদেন প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরী করেছে। অর্থ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এটা ছিল একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কিন্তু প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে এই প্রক্রিয়ার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহের কমতি ছিলোনা। বর্তমানে শতকরা ৯০% গার্মেন্টস কর্মীর হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে এবং তার মধ্যে শতকরা ২০% এর হাতে রয়েছে স্মার্টফোন।

কারখানা ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত নিরীক্ষণ শ্রমিকদের ডিজিটাল ব্যাংকিং বুঝতে সহযোগিতা করছে। ট্রেনিং পরিচালনার পাশাপাশি কারখানা গুলো নির্দিষ্টকর্মী নিয়োগ করেছে শুধুমাত্র শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাংকিং এর যাবতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য। একাউন্ট এর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা রক্ষায় তারা কাজ করে যাচ্ছে কিন্তু তারপরেও কিছু শ্রমিক একাউন্ট এর গোপন নম্বরসহ অন্যানো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্যকে জানিয়ে প্রতারিত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশী অর্থায়নে শ্রমিকদের একাউন্ট এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে বিভিন্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। লিফলেট ও নাটকের মাধ্যমে তাদের কে দেখানো হচ্ছে কিভাবে নিজের একাউন্ট এর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং নির্বিঘ্নে নিজের লেনদেন নিজে পরিচালনা করা যায়।

গত বছর সুইডেনের শতকরা ১২% মানুষ যারা কেবল নগদ অর্থ লেনদেন করেছে। আর সমগ্র নর্ডিক দেশগুলোতে নগদ অর্থ লেনদেনের হার ২০ শতাংশের ও কম। পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্রমাগত কমেছে নগদ লেনদেনের হার। বিশ্বায়নের এই যুগে উন্নত বিশ্বের সাথে উন্নয়নশীল দেশ গুলোর সমন্বয় খুব জরুরি আর সেই পথে একধাপ এগিয়ে গেলো বাংলাদেশ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেছেন ” কেবল মাত্র গার্মেন্টস শিল্প নয় খুব দ্রুত আমরা সবধরণের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানাকে ডিজিটাল প্লাটফর্ম এর আওতায় নিয়ে আসবো”। উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান ধারা অব্যাহত রাখতে এই পদক্ষেপ জরুরি ও সময় উপযোগী’
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে শ্রমিকদের মজুরি প্রদান কে ডিজিটাল প্লাটফর্মের আওতায় নিয়ে আশা ছিল একটা মাইলফলক। উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান এ ধারা অব্যাহত রাখতে শুধু গার্মেন্টস শিল্পই না ধীরে ধীরে সব ধরণের শিল্পকারখানাকে এই ডিজিটাল প্লাটফর্মের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।


এই বিভাগের আরো খবর
greengrocers

Categories

Archives